সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
বাংলার ইতিহাসে ঘষেটী বেগম একটি বহুল আলোচিত নাম। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি বেদনাবিধুর অধ্যায় ছিল স্বামী নওয়াজিশ মুহম্মদ খানের মৃত্যু। ১৭৫৫ সালে নওয়াজিশ মুহম্মদ খানের মৃত্যুকে ঘিরে মুর্শিদাবাদের রাজপরিবার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোকের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
নওয়াজিশ মুহম্মদ খান ছিলেন নবাব আলীবর্দী খানের বড় ভাই হাজি আহমেদের ছেলে এবং আলীবর্দী খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহেরুন্নেসা—পরবর্তীকালের ঘষেটী বেগমের স্বামী। তিনি ঢাকার নায়েব নাজিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৭৪০-এর দশক থেকে ১৭৫৫ সাল পর্যন্ত এ পদে ছিলেন।
নওয়াজিশের সঙ্গে ঘষেটী বেগমের দাম্পত্য জীবন ছিল নিঃসন্তান। এই দম্পতি ঘষেটী বেগমের ছোট বোন আমিনা বেগমের ছেলে ইকরামউদ্দৌলাকে দত্তকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইকরামউদ্দৌলার অকালমৃত্যু তাঁদের জীবনে গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ইকরামউদ্দৌলা গুটিবসন্তে মারা যাওয়ার পর নওয়াজিশ মুহম্মদ খানও খুব অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।
নওয়াজিশ মুহম্মদ খানের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের মতিঝিলের ইতিহাসও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি মতিঝিলের কাছে ‘সাঙ্গ-ই-দালান’ নামে পরিচিত প্রাসাদ নির্মাণ করেন। গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে আনা কালো ব্যাসল্ট পাথরের স্তম্ভ ব্যবহারের কারণে প্রাসাদটি ‘পাথরের প্রাসাদ’ নামে পরিচিতি পায়। একই এলাকায় তিনি একটি মসজিদ ও মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ইকরামউদ্দৌলার মৃত্যুর পর নওয়াজিশের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৭৫৫ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁকে মতিঝিলের মসজিদের সামনে, দত্তকপুত্র ইকরামউদ্দৌলার সমাধির পাশে দাফন করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর ঘটনা কেন এত আলোচিত? এর একটি কারণ ছিল রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং অন্যটি ছিল মুর্শিদাবাদের প্রশাসন ও সমাজে তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থান। পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁর মৃত্যুর সময় বিপুল মানুষের শোক প্রকাশের কথাও পাওয়া যায়। তবে ‘গোটা মুর্শিদাবাদ কেঁদেছিল’—এটি মূলত ঐতিহাসিক বর্ণনার আবেগঘন উপস্থাপন; প্রত্যক্ষ সমসাময়িক নথি ছাড়া এটিকে আক্ষরিক অর্থে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বলা সতর্কতার দাবি রাখে।
নওয়াজিশ মুহম্মদ খানের মৃত্যুর পর তাঁর বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী হন ঘষেটী বেগম। পরবর্তীতে সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ঘষেটী বেগমের রাজনৈতিক বিরোধ বাংলার ইতিহাসে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, ঘষেটী বেগমের স্বামীর মৃত্যুর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অধ্যায় ছিল দত্তকপুত্র ইকরামউদ্দৌলার অকালমৃত্যু এবং তার পর নওয়াজিশের শোক ও অসুস্থতা। এই ঘটনাই নওয়াজিশ-ঘষেটী পরিবারের ইতিহাসকে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের একটি বেদনাবিধুর অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
তথ্যসূত্র: Banglapedia, ঐতিহাসিক গবেষণা ও প্রকাশিত জীবনীমূলক তথ্য।
নোট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত দীর্ঘ বর্ণনার কিছু তথ্যের সঙ্গে প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সূত্রের পার্থক্য থাকতে পারে। তাই যাচাইযোগ্য তথ্য ও প্রচলিত বর্ণনাকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
