উপজেলা প্রতিনিধি, পাবনা
পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের জোত কাকুরিয়া কলাবাগান এলাকায় পদ্মা নদী থেকে চায়না কাটার মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলনের কারণে ওই এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ভোররাত থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েকটি চায়নিজ কাটার মেশিন দিয়ে পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু শতাধিক ট্রলারের মাধ্যমে পাবনার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হচ্ছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জোত কাকুরিয়া কলাবাগান এলাকায় নদীতে একাধিক ড্রেজার বা কাটার মেশিন দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন ও বিক্রি করা হচ্ছে। তবে এ বাণিজ্যের আর্থিক পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্টদের প্রকৃত আয় সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভাঙনে কৃষিজমি নিয়ে উদ্বেগ
কৃষকদের অভিযোগ, নদীর তীরের কাছ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে স্রোতের গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ায় আবাদি জমি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বালু উত্তোলনে বাধা দিতে গেলে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন।
প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু ব্যক্তিকে ‘ম্যানেজ’ করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এমনকি নৌপুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নৌযান এলাকায় চলাচলের সময়ও বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকার অভিযোগ করেছেন তারা।
তবে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত—এমন অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জের সহযোগী হিসেবে পরিচিত আব্দুল আলিম এবং পাবনার দোগাছী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হযরত আলীসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই বালু উত্তোলন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া চর বলরামপুর এলাকার খোকন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও বিএনপির নাম ব্যবহার করে বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
মঞ্জু শেখ নিহতের ঘটনার প্রসঙ্গ
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগে একই এলাকায় বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে মঞ্জু শেখ নামের এক বিএনপি নেতা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বালু উত্তোলনকারীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ফলাফলই প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত করতে পারে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগের ঘটনার পরও একই এলাকায় পুনরায় বালু উত্তোলন শুরু হওয়ায় নতুন করে সংঘাত বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল আলিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পাবনার পুলিশ সুপার (এসপি) আশ্রাফ আলী বলেন, “অনেকেই টেলিফোনে অভিযোগ জানিয়েছেন। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি আপনাদের কাছ থেকে জানলাম। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন আইনসম্মতভাবে হচ্ছে কি না, সংশ্লিষ্টদের বৈধ অনুমোদন বা ইজারা রয়েছে কি না এবং এর ফলে নদীর তীর ও কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করা হোক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে অপরিকল্পিত ও অনুমোদনহীনভাবে বালু উত্তোলন নদীর তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে ভাঙন বাড়াতে পারে। তাই পরিবেশ, নদী ও কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
