অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আব্দুস শুকুর
পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর পাসের হার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করেনি, কেউ দায় দিচ্ছেন শিক্ষকদের, কেউ আবার প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে—
একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে প্রকৃত কারণ কী?
শুধু সরকারকে দায়ী করলেই কি দায়িত্ব শেষ?
শুধু শিক্ষককে দোষ দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
নাকি সন্তানের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে, তার পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে খোঁজ না নিয়ে অভিভাবকরাও নিজেদের দায় এড়াতে পারেন না?
অনুসন্ধানে সামনে আসছে—দায় একক নয়
শিক্ষার্থীর ফলাফল কোনো একটি কারণের সরাসরি ফল নয়। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ, নিয়মিত ক্লাস করা, বাড়িতে পড়ার পরিবেশ, পরিবারের তদারকি, শিক্ষকের পাঠদান, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা—সবকিছু মিলেই একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন তৈরি হয়।
তাই ফলাফল খারাপ হলেই একজনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো বাস্তবসম্মত নয়।
তবে অভিভাবকদের নিজেদের কাছেও কিছু কঠিন প্রশ্ন রাখা দরকার।
সন্তান প্রতিদিন কত ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার করছে—আপনি কি জানেন?
রাতে কখন ঘুমায়—আপনি কি খোঁজ নেন?
স্কুল-কলেজে যাওয়ার কথা বলে সত্যিই ক্লাস করছে কি না—আপনি কি কখনো যাচাই করেছেন?
পরীক্ষার আগে সে কতটা পড়াশোনা করেছে—শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনই কি তা জানতে চেয়েছেন?
মোবাইল কি ফলাফল খারাপের মূল কারণ?
এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি।
মোবাইল ফোন নিজে শিক্ষার শত্রু নয়। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও, তথ্য অনুসন্ধান ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের উপকার করতে পারে।
কিন্তু শিক্ষার পরিবর্তে যদি মোবাইলের বড় অংশজুড়ে থাকে গেম, বিনোদন, অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং ও দীর্ঘ সময়ের অনলাইন যোগাযোগ, তখন সেটি পড়াশোনার সময় ও মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকে একেবারে সাদা-কালোভাবে দেখা হয়নি। অতিরিক্ত অশিক্ষামূলক ব্যবহার শিক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, আবার শিক্ষামূলক ও পরিমিত ব্যবহার শেখার ক্ষেত্রে সহায়কও হতে পারে।
অর্থাৎ প্রশ্ন হওয়া উচিত—
সন্তানের হাতে মোবাইল আছে কি না, তা নয়; মোবাইলটি কী কাজে এবং কত সময় ব্যবহার করছে?
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
সন্তানের হাতে একটি স্মার্টফোন তুলে দেওয়া সহজ।
কিন্তু সেই স্মার্টফোন ব্যবহারের নিয়ম তৈরি করা, রাতে কখন ফোন বন্ধ থাকবে তা নির্ধারণ করা, পড়ার সময় ফোন দূরে রাখা, সন্তান কোথায় যাচ্ছে তা জানা এবং তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা—এগুলোই প্রকৃত দায়িত্ব।
সন্তানকে আলাদা পড়ার ঘর দেওয়া ভালো। কিন্তু সেই ঘরে সে বই খুলে বসেছে, নাকি মোবাইল হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাচ্ছে—সেটিও দেখতে হবে।
শুধু সুযোগ-সুবিধা দিলেই অভিভাবকত্ব শেষ হয় না; প্রয়োজন তদারকি ও দিকনির্দেশনা।
শিক্ষককে শাসনের অধিকার মানে নির্যাতনের অধিকার নয়
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
শিক্ষার্থীর ভুল হলে শিক্ষক তাকে সংশোধন করবেন, শৃঙ্খলা শেখাবেন—এটি শিক্ষার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু শাসনের নামে শারীরিক নির্যাতন, অপমান বা অবমাননাকর আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আবার সন্তানের ভুল ধরিয়ে দিলে শিক্ষককে অপমান করা, হুমকি দেওয়া কিংবা শিক্ষকের বিরুদ্ধে অযৌক্তিকভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়াও সন্তানকে ভুল বার্তা দেয়।
অভিভাবকের দায়িত্ব হলো—শিক্ষকের বিরুদ্ধে অন্ধভাবে দাঁড়ানো নয়, আবার সন্তানের অন্যায়ও অন্ধভাবে সমর্থন না করা।
শিক্ষার্থী অন্যায় করলে তাকে বুঝিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষক অন্যায় করলে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনসম্মতভাবে অভিযোগ জানাতে হবে।
সন্তান স্কুলে যাচ্ছে—কিন্তু ক্লাস করছে তো?
এটি অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের জায়গা।
বাড়ি থেকে সন্তান স্কুল-কলেজের উদ্দেশ্যে বের হলো—এতেই কি দায়িত্ব শেষ?
কখনো কি অভিভাবক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছেন?
সন্তানের উপস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন?
ক্লাসে তার অংশগ্রহণ কেমন, তা জেনেছেন?
বন্ধুবান্ধব কারা—তা জানার চেষ্টা করেছেন?
পরীক্ষার আগে তার পড়াশোনার অগ্রগতি সম্পর্কে শিক্ষক বা সন্তানের সঙ্গে কথা বলেছেন?
যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে শুধু ফলাফল খারাপ হওয়ার পর শিক্ষক কিংবা সরকারকে দায়ী করার আগে অভিভাবকদেরও নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে হবে।
তবে শিক্ষকদের দায়ও অস্বীকার করা যাবে না
শিক্ষার্থীর ফলাফল খারাপ হলে সব দায় অভিভাবকের—এমন বক্তব্যও সঠিক নয়।
শিক্ষকের দায়িত্ব হলো পাঠদানকে কার্যকর করা, দুর্বল শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলা।
একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করেও যদি কোনো বিষয়ে দুর্বল থাকে, তাহলে তার দুর্বলতার জায়গাটি চিহ্নিত করে সহযোগিতা করা শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ।
একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পাঠদানের মান এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
সরকারের দায় কোথায়?
শিক্ষাব্যবস্থার নীতি, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
তাই ফলাফল খারাপ হলে সরকারের নীতির সমালোচনা করা যাবে না—এমন নয়।
কিন্তু সব সমস্যার দায় শুধু সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলে পরিবারের দায়িত্ব, শিক্ষার্থীর দায়িত্ব ও শিক্ষকের দায়িত্ব—সবই আড়ালে চলে যায়।
এতে সমস্যার সমাধান হবে না।
আসল অনুসন্ধান হওয়া উচিত—আমরা কোথায় ব্যর্থ?
ফলাফল খারাপ হওয়ার পর আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—
শিক্ষার্থী কি নিয়মিত পড়েছে?
অভিভাবক কি নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন?
শিক্ষক কি দুর্বল শিক্ষার্থীকে পর্যাপ্ত সহায়তা দিয়েছেন?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করেছে?
রাষ্ট্র কি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে না গিয়ে শুধু একজনকে দোষী বানালে পরবর্তী বছরও একই সমস্যা থেকে যেতে পারে।
ফলাফল খারাপ—এখন করণীয় কী?
অভিভাবকদের উচিত সন্তানের ফলাফল দেখে প্রথমে রাগ না করে তার দুর্বলতা চিহ্নিত করা।
শিক্ষার্থীর জন্য নির্দিষ্ট পড়ার সময় নির্ধারণ করতে হবে। মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে যুক্তিসঙ্গত সীমা রাখতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত স্কুল-কলেজে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।
শিক্ষকদেরও শুধু নম্বরের দিকে না তাকিয়ে শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে।
আর শিক্ষার্থীদেরও মনে রাখতে হবে—
মোবাইল, গেম, বিনোদন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জীবনের অংশ হতে পারে; কিন্তু এগুলো পড়াশোনার বিকল্প নয়।
শেষ কথা—দোষারোপ নয়, দায়িত্ব নিন
একটি খারাপ ফলাফল কোনো একটি পক্ষের ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। আবার এটি কাউকে দায়মুক্তিও দেয় না।
শিক্ষার্থীকে পড়তে হবে।
অভিভাবককে গাইড করতে হবে।
শিক্ষককে আন্তরিকভাবে পড়াতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে।
রাষ্ট্রকে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এই পাঁচটি জায়গার যেকোনো একটিতে বড় ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব শিক্ষার্থীর ফলাফলে পড়তে পারে।
তাই ফলাফল খারাপ হওয়ার পর শুধু বলবেন না—“সরকার দায়ী”, “শিক্ষক দায়ী” কিংবা “ছাত্র-ছাত্রী পড়েনি”।
একবার নিজের কাছেও প্রশ্ন করুন—
“আমার সন্তানকে আমি গত এক বছরে কতটা সময় দিয়েছি?”
“তার মোবাইল ব্যবহারের খোঁজ কতবার নিয়েছি?”
“তার শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কতবার যোগাযোগ করেছি?”
“শুধু ফলাফল চেয়েছি, নাকি ফলাফল পাওয়ার মতো পরিবেশও তৈরি করেছি?”
এই আত্মসমালোচনাই হয়তো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে জরুরি অনুসন্ধান।
সংযোগ বাংলা টিভির পক্ষ থেকে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান—ফলাফল নিয়ে শুধু দোষারোপ নয়; কারণ খুঁজুন, দায়িত্ব নিন এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করুন।
নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
যোগাযোগ: 01727034690
