নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন কমিশন উভয় প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে এবং কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় ভোট গ্রহণের পথ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি কি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন?
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ এটি একটি পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা।
এবার জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য। ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
তাহলে সাধারণ মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না কেন?
কারণ বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে। জনগণ সংসদ সদস্য নির্বাচনে সরাসরি ভোট দেন; আর সেই সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন।
সুতরাং ‘জনগণের ভোট নেই’—এটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বর্তমান সাংবিধানিক পদ্ধতি বোঝাতে বলা যেতে পারে; কিন্তু এটিকে আইনবহির্ভূত নির্বাচন বলা সঠিক নয়।
যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও জনগণের সরাসরি ভোট নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থাৎ এটি কেবল নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন হবে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তনের।
‘রাষ্ট্রপতি ভাগ হয়ে গেল’—বিষয়টি কীভাবে দেখা উচিত?
রাজনৈতিক বক্তব্যে কেউ বলতে পারেন—রাষ্ট্রপতি অমুক দলের, আবার কেউ বলতে পারেন অমুক জোটের। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নন; তিনি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি।
এবার বিএনপি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করেছে, আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে। ফলে রাজনৈতিকভাবে এটি দুটি পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও নির্বাচিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হবেন।
হিসাব কী বলছে?
সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় রাজনৈতিক হিসাবের দিক থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে আছেন—এমন ধারণা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে কাউকে নিশ্চিতভাবে বিজয়ী বলা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে যথাযথ নয়। ভোট গ্রহণ ও গণনা শেষে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণাই চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু?
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিশেষ ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। আর ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতির পদে থাকতে পারেন না।
জনতার সরাসরি ভোট হলে কী হতো?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের বিষয়। জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়ত। তবে এর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদীয় সরকারব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক দায়িত্বের কাঠামো নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠত।
অতএব, ‘জনগণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে’—এমন ব্যবস্থা চালু করতে হলে শুধু নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো নিয়েও বিস্তৃত সাংবিধানিক আলোচনা প্রয়োজন।
শেষ কথা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু রাষ্ট্রপতির পদকে কোনো নির্দিষ্ট দলের পদ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পদ হিসেবে দেখা জরুরি।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। এবার বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুখোমুখি হওয়ায় নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। এখন মূল বিষয় হলো—সংসদ সদস্যরা কাকে ভোট দেন এবং নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত কাকে বিজয়ী ঘোষণা করে।
আর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনগণের সরাসরি ভোটের দাবি উঠলে সেটি হওয়া উচিত সংবিধান, আইন, ক্ষমতার ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের আলোকে একটি জাতীয় পর্যায়ের গঠনমূলক আলোচনা।
নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম

You missed