হাওর, নদী, প্রকৃতি আর মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে সুনামগঞ্জের লোকসংগীত। মরমি গান, বাউল, ভাটিয়ালি, ধামাইলসহ নানা লোকধারায় এ অঞ্চলের কবি, সাধক, গীতিকার ও শিল্পীরা বাংলা লোকসংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সাংস্কৃতিক তথ্যেও সৈয়দ শাহনূর, রাধারমণ, হাসন রাজা, দুর্বিন শাহ, কালা শাহ ও শাহ আবদুল করিমসহ বহু লোকসাধকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। �
সুনামগঞ্জ জেলা +১
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে সুনামগঞ্জের লোকগানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়জন শিল্পী, গীতিকার ও সাধকের ছবি তুলে ধরা হয়েছে। ছবিতে রয়েছেন—হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ দত্ত, দুর্বিন শাহ, ক্বারী আমির উদ্দিন, শফিকুন্নূর, কালা শাহ, সৈয়দ শাহনূর ও পাগল হাসান। তবে ছবিটি নিজে কোনো প্রামাণ্য প্রকাশনা বা সরকারি তালিকা কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো উৎস পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে সুনামগঞ্জের লোকশিল্পীদের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত; পূর্ণাঙ্গ তালিকা হিসেবে নয়।
লোকগানের ভিন্ন ভিন্ন ধারার স্রষ্টা
রাধারমণ দত্ত সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের কেশবপুরের গীতিকবি হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর রচনায় প্রেম, বিরহ, ভক্তি ও রাধাকৃষ্ণভাবনার পাশাপাশি ধামাইল গানের সমৃদ্ধ ধারা রয়েছে। গবেষণামূলক সূত্রে তাঁর তিন হাজারের বেশি গানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। �
Home
হাসন রাজা সুনামগঞ্জের মরমি গানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর পাশাপাশি দুর্বিন শাহ বাউল-দর্শন, দেহতত্ত্ব ও মানবতাবাদী ভাবনার গান রচনা করেছেন। গবেষক সুমনকুমার দাশের আলোচনায় দুর্বিন শাহের ৩৫৫টি গান সংকলিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। �
সুনামগঞ্জের খবর
শাহ আবদুল করিম সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধলের সন্তান। তাঁর গানে ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবন, দুঃখ-কষ্ট, প্রেম, সমাজ ও দর্শনের নানা দিক উঠে এসেছে। তাঁর গান সুনামগঞ্জ ছাড়িয়ে বাংলাদেশের লোকসংগীতের বৃহত্তর পরিসরে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছে। �
bdnews24.com +১
সৈয়দ শাহনূর-এর নামও সুনামগঞ্জের লোকসাহিত্য ও বাউল-ফকির ধারার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সরকারি সাংস্কৃতিক তথ্যে রয়েছে। তাঁর গান ও সাধনাকে ঘিরে সুনামগঞ্জসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। �
সুনামগঞ্জ জেলা +১
কালা শাহ-এর নামও সুনামগঞ্জের লোকসাধকদের তালিকায় পাওয়া যায়। তাঁর গান ও রচনাকে ঘিরে স্থানীয় লোকসংগীতের আলাদা একটি ঐতিহ্য রয়েছে। �
সুনামগঞ্জ জেলা
অন্যদিকে ক্বারী আমির উদ্দিন বিভিন্ন মরমি ও বাউল কবির গান পরিবেশন করে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর গাওয়া গানের মধ্যে সৈয়দ শাহনূর, রাধারমণ, হাসন রাজা, দুর্বিন শাহ ও শাহ আবদুল করিমের গানও ছিল বলে গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ রয়েছে। �
গানপার
শফিকুন্নূর ছিলেন সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের একজন বাউলশিল্পী ও গীতিকার। তাঁর জীবনী ও গানের ওপর প্রকাশিত গবেষণামূলক লেখায় তাঁর রচিত ও সংগৃহীত লোকগানের উল্লেখ রয়েছে। �
সুনামগঞ্জের খবর +১
আর পাগল হাসান তুলনামূলকভাবে পরবর্তী প্রজন্মের গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর সুনামগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছিলেন। �
সুনামগঞ্জের খবর
প্রজন্ম বদলেছে, গান থেকে গেছে
এই নয়জনের সৃষ্টিকর্ম ও সংগীতচর্চার সময়কাল এক নয়। কেউ উনিশ শতকের, কেউ বিশ শতকের, আবার কেউ সাম্প্রতিক সময়ের শিল্পী। তাঁদের গানের বিষয়, দর্শন, ভাষা ও পরিবেশনার ধরনেও পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একটি জায়গায় তাঁদের মিল—সুনামগঞ্জ ও ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবন, অনুভূতি, প্রকৃতি ও লোকঐতিহ্য তাঁদের সৃষ্টিতে কোনো না কোনোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের লোকগান তাই শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি এ অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস, জীবনবোধ, প্রেম-বিরহ, আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক বাস্তবতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল।
আজকের প্রজন্মের কাছে প্রশ্ন হতে পারে—এই নয়জনের মধ্যে আপনি কার গান বেশি শুনেন?
হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ, দুর্বিন শাহ, ক্বারী আমির উদ্দিন, শফিকুন্নূর, কালা শাহ, সৈয়দ শাহনূর নাকি পাগল হাসান?
পছন্দ যার যার—কিন্তু তাঁদের সৃষ্টিকে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজ: সিলেট প্রতিনিধি
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম

You missed