সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ সামনে এলে কোথাও কোথাও অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর কিংবা পরিবারের সদস্যদের হয়রানির ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি পাবনা সদর উপজেলার কুলুনিয়া গ্রামে ধর্ষণ মামলার সন্দেহভাজনের বাড়িতে জনতার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছিল, অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং মূল্যবান সামগ্রী রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছিল।
প্রশ্ন হচ্ছে—একজন ব্যক্তি অপরাধের সঙ্গে জড়িত হলে তার পরিবারের অন্য সদস্যরা কেন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন?
১. অপরাধ একজনের—শাস্তি কেন পুরো পরিবারের?
ফৌজদারি অপরাধের দায় ব্যক্তির অপরাধের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কেউ অপরাধ করলে তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে।
অভিযুক্ত ব্যক্তির বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন কিংবা পরিবারের অন্য সদস্য কোনো অপরাধে জড়িত না থাকলে তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর, সম্পদ নষ্ট করা বা শারীরিকভাবে হয়রানি করা ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ অপরাধের বিচার আদালতের মাধ্যমে হওয়াই আইনের মূল কাঠামো।
২. কেন মানুষের মধ্যে এত উত্তেজনা?
অপরাধের ঘটনায় মানুষের ক্ষোভের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের সমস্যা এবং মামলার বিভিন্ন ধাপে সময় লাগা—এসব বিষয় জনমনে হতাশা তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু বিচারব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সব ধরনের জনতার সহিংসতার একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অসম্পূর্ণ তথ্য, আবেগপ্রবণ প্রচার এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।
তাই অপরাধের অভিযোগ উঠলেই প্রতিশোধ নয়—দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে উত্তেজনা কমানোর কার্যকর পথ।
৩. বিচার দ্রুত করার জন্য আইনে ইতোমধ্যে কী ব্যবস্থা আছে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে রাখা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
একই সংশোধনে ধর্ষণ মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা আরও কঠোর করা হয়েছে। সাধারণভাবে তদন্ত ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে; যুক্তিসংগত কারণে তা সম্ভব না হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আরও ১৫ কার্যদিবস সময় দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনীয় ডিএনএ পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময় বাড়ানোর বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে।
অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০(৩) ধারায় মামলা বিচারের জন্য গ্রহণের পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে।
অতএব, শুধু নতুন আইন তৈরি করাই যথেষ্ট নয়—আইনে নির্ধারিত সময়সীমা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
৪. সমাজপ্রধান ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের দায়িত্ব কোথায়?
অপরাধ দমন শুধু পুলিশের দায়িত্ব—এমন ধারণা সমাজে থাকা উচিত নয়।
একটি এলাকায় মাদক, কিশোর অপরাধ, ইভটিজিং, পারিবারিক সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন কিংবা অন্যান্য সামাজিক অপরাধ বাড়লে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ এবং সচেতন নাগরিকদেরও প্রতিরোধমূলক ভূমিকা রয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার—সমাজপ্রধানের ভূমিকা বিচারকের ভূমিকা নয়।
অপরাধের অভিযোগ উঠলে সামাজিকভাবে তথ্য গোপন করা, অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করা বা সালিশের মাধ্যমে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ চাপা দেওয়া উচিত নয়। বরং দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং ভুক্তভোগীকে নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়াই দায়িত্বশীল ভূমিকা।
৫. বিচার বিলম্বিত হলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে—কিন্তু গণপিটুনি সমাধান নয়
মানুষ দ্রুত বিচার চায়—এটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু দ্রুত বিচার মানে তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বাদ দিয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়া নয়। দ্রুত বিচার হতে হবে ন্যায্য, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক।
কারণ ভুল ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হলে প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যেতে পারে। আবার নিরপরাধ কাউকে অভিযুক্ত করলে একটি পরিবারের ওপর নতুন অন্যায় তৈরি হয়।
তাই প্রয়োজন—তদন্ত, ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা, সাক্ষ্য সংগ্রহ, প্রসিকিউশন এবং আদালতের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো।
২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে ধর্ষণ মামলার ডিএনএ পরীক্ষার ফল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
৬. “১০ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বিচার”—এটি জনদাবি হতে পারে, কিন্তু আইনগত বাস্তবতা আলাদা
অনেক সাধারণ মানুষ গুরুতর অপরাধের দ্রুততম বিচার ও শাস্তি চান। ১০ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার দাবিও জনপরিসরে উঠতে পারে।
তবে এ দাবিকে “দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের মত” হিসেবে উল্লেখ করতে হলে নির্ভরযোগ্য জাতীয় জরিপ প্রয়োজন। এমন জরিপের প্রমাণ ছাড়া এই সংখ্যা সংবাদে ব্যবহার করা উচিত নয়।
আর বিচার শেষ করা এবং দণ্ড কার্যকর করা এক বিষয় নয়। রায়, আপিলসহ আইনগত প্রতিকার এবং দণ্ড কার্যকরের জন্য পৃথক আইনগত ধাপ থাকতে পারে।
সুতরাং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে লক্ষ্য হওয়া উচিত—অযৌক্তিক বিলম্ব বন্ধ করা এবং আইনে নির্ধারিত সময়সীমা বাস্তবায়ন করা।
৭. মিথ্যা সংবাদ ও গুজবের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন
অপরাধের ঘটনায় যাচাই না করে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে প্রচার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুল তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে জনমনে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। ফলে নিরপরাধ ব্যক্তি ও তার পরিবার সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র, পুলিশের বক্তব্য, মামলার নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের জন্য আইনেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে সাংবাদিক বা যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত।
৮. সরকারের দায়িত্ব কোথায়?
বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তদন্তে প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তি, ফরেনসিক সক্ষমতা, প্রসিকিউশন ব্যবস্থার দক্ষতা, পর্যাপ্ত আদালত ও বিচারক এবং মামলার ব্যবস্থাপনা—এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যেসব মামলায় আইন নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম হচ্ছে, সেগুলোর কারণও নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
২০২৬ সালের সংশোধিত আইনে তদন্ত নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দায়ী হলে তার অদক্ষতা বা অসদাচরণের বিষয়টি বিবেচনা এবং প্রয়োজনে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
৯. আমাদের প্রত্যাশা—বিচার হোক দ্রুত, কিন্তু আইনের মধ্য দিয়ে
একজনের অপরাধের কারণে তার পুরো পরিবার যেন সামাজিক শাস্তির শিকার না হয়।
অপরাধীর বিচার হবে আদালতে।
ভুক্তভোগী পাবেন নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার।
নিরপরাধ ব্যক্তি পাবেন আইনি সুরক্ষা।
সাংবাদিকতা হবে তথ্য যাচাইভিত্তিক।
সমাজপ্রধানরা অপরাধ প্রতিরোধে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন।
আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে দ্রুত ও কার্যকর বিচারপ্রক্রিয়া।
জনতার ক্ষোভকে আইনের শাসনের শক্তিতে পরিণত করা প্রয়োজন—জনতার হাতে বিচার তুলে দিয়ে নয়।
কারণ একটি অপরাধের বিচার করতে গিয়ে যদি আরেকটি অন্যায় ঘটে, তাহলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং নতুন ক্ষত তৈরি হয়।
নিউজ ঢাকা প্রতিনিধি
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম

You missed