নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
📞 01727034690
কোথায় দাদা-দাদি?
কোথায় নানা-নানি?
অবুঝ শিশুর পথচলা…
জীবনের গল্প সবার একরকম নয়। কারও শৈশব কাটে বাবা-মায়ের আদর-স্নেহে, আর কারও শৈশব শুরু হয় হারানোর বেদনা দিয়ে।
আমার গল্পটাও তেমনই।
তখন আমার বয়স আনুমানিক চার কিংবা পাঁচ বছর। পৃথিবী সম্পর্কে কিছুই বোঝার মতো বয়স তখনো হয়নি। বাবার সঙ্গে গরু রাখতাম, খেলতাম, হাসতাম। মনে হতো—এভাবেই বুঝি ভালোই কেটে যাবে জীবন।
কিন্তু হঠাৎ একদিন সবকিছু থেমে গেল।
আমার বাবা মারা গেলেন।
মৃত্যু কী, তখন আমি জানতাম না। বাড়িতে মানুষের ভিড়, চারদিকে কান্নার শব্দ। সবাই আমার বাবাকে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে। আমিও কিছু না বুঝে হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় মানুষের পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম।
শেষ পর্যন্ত সবাই পৌঁছাল কবরস্থানে।
বাবাকে কবরে রেখে যখন সবাই চলে আসতে শুরু করল, তখন আমার ছোট্ট হৃদয় যেন কিছুতেই বিষয়টি মেনে নিতে পারছিল না।
আমি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলাম—
“বাবাকে রেখে যাচ্ছ কেন? বাবাকে রেখে তোমরা চলে যাচ্ছ কেন?”
কেউ কোনো উত্তর দেয়নি।
আমি জানতাম না—সেদিনই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ছায়াটি হারিয়ে গেছে।
বাড়িতে ফিরে মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনে দৌড়ে গেলাম। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
“তোমার বাবাকে কোথায় রেখে আসলা? তোমার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।”
মায়ের সেই কথার অর্থও তখন পুরোপুরি বুঝিনি।
শুধু বুঝেছিলাম—বাবা আর আসবেন না।
তখনও জানতাম না “এতিম” কাকে বলে। অথচ আমি নিজেই হয়ে গিয়েছিলাম একজন এতিম শিশু।
কিছুদিন পর এলো ঈদ।
মেজো ভাই ও বড় ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে ঈদগাহের দিকে রওনা হলেন। আমার মনে তখন অদ্ভুত আনন্দ—কতদিন বাবাকে দেখি না, হয়তো আজ বাবার সঙ্গে দেখা হবে!
ভাইদের সঙ্গে বাবার কবরের কাছে গেলাম। সবাই দুই হাত তুলে দোয়া করল, কেউ কেউ কাঁদল। আমিও হাত তুলে কাঁদলাম।
কিন্তু…
বাবার দেখা আর পেলাম না।
কিছুটা দূরেই ছিল বিশাল এক বটগাছ। তার নিচে কয়েক গ্রামের মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে বসে ছিলেন। সবার মাথায় টুপি। ঈদের নামাজের প্রস্তুতি চলছে।
আমি বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম—
“এখানে কী হবে?”
ভাই বললেন, “এখানে ঈদের নামাজ হবে। চুপ করে বসে থাকো। গাছে অনেক মৌমাছির চাক আছে, দৌড়াদৌড়ি করলে কামড় দেবে।”
ভয়ে চুপ করে বসে রইলাম।
ঈদের নামাজ শেষ হলো। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বী কিছু কথা বললেন। সবাই একসঙ্গে হাত তুলে মোনাজাত করলেন।
আমি আবার ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম—
“এই জায়গার নাম কী?”
ভাই বললেন—
“এটা জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থান ও ঈদগাহ ময়দান।”
সেদিন বুঝিনি, এই জায়গাটির সঙ্গে আমার জীবনের গল্প একদিন এত গভীরভাবে জড়িয়ে যাবে।
এরপর শুরু হলো অভাবের জীবন
আমরা পাঁচ বোন ও তিন ভাই—সবাই তখন এতিম।
অসহায় মা সংসার চালাতে না পেরে আমাকে মধুপুরে নানির বাড়িতে রেখে গেলেন।
দাদা-দাদি আমার জন্মের আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়েছে। নানা তখন আর বেঁচে নেই। নানির আদরেই শুরু হলো আমার জীবনের নতুন অধ্যায়।
নানি, মামা-মামি এবং প্রতিবেশীরা আমাকে আপন সন্তানের মতো ভালোবাসতেন।
মোঃ জয়েন সরদার, মোঃ কিয়াম উদ্দিন, মোঃ কহের সরদার, মোঃ মোজাম্মেল হোসেন কারী, মোঃ বকুল মাস্টার ও মোঃ হারুন খন্দকার—এমন অনেক মানুষের স্নেহ-ভালোবাসায় মধুপুর গ্রামেই ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছি।
সময়ের নিষ্ঠুরতায় তাঁদের অনেকেই আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তাঁদের ভালোবাসার স্মৃতি আজও হৃদয়ের গভীরে রয়ে গেছে।
শিক্ষা থেকে শিল্প-সংস্কৃতির পথে
কাঁঠালবাড়িয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা দিয়ে শুরু হয় আমার ছাত্রজীবন। এরপর ধর্মগ্রাম হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং সর্বশেষ পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করি।
এরপর জীবনের আরেকটি অধ্যায়—শিল্প ও সংস্কৃতি।
শিল্পী ওবায়দুল্লাহ তারেক এবং আমি একসঙ্গে পথচলা শুরু করি। ১৯৯২ সালে পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসার ইসলামী সংস্কৃতির পরিচালক ও ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোঃ আব্দুল খালেক ভাইয়ের হাত ধরে শুরু হয় প্রত্যাশা শিল্পীগোষ্ঠী-র পথচলা।
অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। পরে ২০০১ সালে প্রত্যাশা শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যক্রম বিলুপ্ত হয়।
এরপর আতাইকুলা বাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় সৃজন সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ, পাবনা।
শিল্পী ওবায়দুল্লাহ তারেকের অডিও অ্যালবাম “জীবন পাখি যায় উড়ে”সহ একাধিক অ্যালবাম সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
শুরু হয় নাট্যাঙ্গনের পথচলাও।
সৃজন সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের নাট্য বিভাগের শর্টফিল্ম প্রতিযোগিতায় আমি নাট্যশিল্পী হিসেবে অংশ নিই। আমাদের প্রথম শর্টফিল্ম “অবদান”।
আলহামদুলিল্লাহ—সারা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতায় আমরা প্রথম স্থান অর্জন করতে সক্ষম হই।
এরপর একের পর এক শর্টফিল্ম নির্মাণ এবং সৃজন সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের শিল্পী ও নাট্য বিভাগের কর্মকাণ্ড সারা দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
একটি পরামর্শ, আরেকটি নতুন স্বপ্ন
একসময় শিল্পী ওবায়দুল্লাহ তারেকের বিয়ে হয়। কয়েক বছর পর তাঁর প্রথম স্ত্রী মোছাঃ শাম্মী খাতুন আমাকে বলেছিলেন—
“ভাইয়া, আপনি একটা মিডিয়া চালু করেন। আপনার তো ব্যাপক সাড়া রয়েছে।”
সেই কথাটি হৃদয়ে গেঁথে যায়।
পরামর্শ, স্বপ্ন আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করি—
সংযোগ বাংলা টিভি
আজ ২০২৬ সাল।
পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়—কত পথ পেরিয়ে এসেছি!
একদিন যে ছোট্ট শিশুটি বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিল না—“বাবাকে রেখে সবাই চলে যাচ্ছে কেন?”
সেই শিশুটিই আজ মানুষের কথা বলতে চায়, মানুষের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরতে চায়, সমাজের সত্য ও বাস্তবতা মানুষের সামনে তুলে ধরতে চায়।
অনেক কষ্ট, পরিশ্রম, সংগ্রাম ও সাধনার মধ্য দিয়ে আজ আমি এই পর্যায়ে আসতে পেরেছি।
আলহামদুলিল্লাহ।
আমার অসহায় মা এখনো বেঁচে আছেন। আজও তাঁর দোয়াই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
আর আমার সেই প্রিয় বাবা—
যাঁকে ছোটবেলায় বুঝে ওঠার আগেই হারিয়েছিলাম,
যাঁকে রেখে আসার সময় কাঁদতে কাঁদতে প্রশ্ন করেছিলাম—
“বাবাকে রেখে যাচ্ছ কেন?”
সেই বাবা আজও শুয়ে আছেন—
জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানে।
জীবনের শুরুতে ছিল বাবাকে হারানোর কান্না।
তারপর ছিল অভাব, অনিশ্চয়তা আর সংগ্রাম।
ছিল মায়ের ত্যাগ, নানির ভালোবাসা, মানুষের সহযোগিতা।
ছিল শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, নাট্যাঙ্গন এবং অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা।
আর আজ সেই পথচলারই একটি নাম—
সংযোগ বাংলা টিভি।
জীবনের কাছে আমার চাওয়া খুব বেশি নয়।
শুধু চাই—
সত্যের পথে থাকতে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং মায়ের দোয়া নিয়ে জীবনের বাকি পথটুকু এগিয়ে যেতে।
কারণ আমি জানি—
যে শিশু বাবাকে হারিয়ে পথ চলতে শিখেছে,
সে জীবনের প্রতিটি কষ্টের মূল্য বোঝে।
আর সেই কষ্ট থেকেই জন্ম নেয় মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন।
নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
📞 01727034690
