১৫ বছর নির্বিঘ্নে চাষাবাদ, হঠাৎ কেন ঘেরা উপড়ে ফেলা ও গাছ নষ্টের অভিযোগ? মাঠে কৃষি কর্মকর্তাদের তদন্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক | আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
পাবনার আতাইকুলা থানার শিমুল চড়া গ্রাম। একদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্মশান, অন্যদিকে কৃষকের চাষের জমি। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে যে জমিতে কোনো বড় ধরনের বিরোধের কথা শোনা যায়নি, চলতি বছরে সেই জমিতেই একের পর এক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ। প্রশ্ন উঠছে—হঠাৎ কেন এই পরিস্থিতি? কার ইশারায় বারবার কৃষকের জমির ঘেরা উপড়ে ফেলা হচ্ছে? আর এর পেছনে আসল ঘটনা কী?
সংযোগ বাংলা টিভির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শিমুল চড়া গ্রামের শ্মশান সংলগ্ন কৃষিজমির দুই অংশ দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষ চাষাবাদের জন্য ব্যবহার করে আসছেন। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ বছর ধরে জমি কটে দেওয়া ও চাষাবাদ চললেও এ নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি।
কিন্তু চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি বদলে যায়।
অভিযোগের তীর বাবু ও তার ছেলে রাসেলের দিকে
স্থানীয়দের অভিযোগ, সর্দারপাড়া গ্রামের মৃত আহেদের ছেলে ভ্যানচালক বাবু ও তার ছেলে রাসেল পাশের কৃষিজমিতে বারবার ক্ষয়ক্ষতি করছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছুদিন আগে জমির পাশে থাকা ধরন্তপল্লার গাছে বিষ প্রয়োগ করে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। এরপর জমির ঘেরা উপড়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পরও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং আবারও জমির ঘেরা উপড়ে ফেলা হয়।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—
একবার নয়, বারবার কেন?
কার স্বার্থে?
কৃষকের ক্ষতি করে লাভবান হচ্ছেন কে?
আর এতদিন কোনো সমস্যা না থাকার পর এবারই বা কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো?
শ্মশানের সীমানা নিয়ে কি কোনো বিভ্রান্তি আছে?
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জমিটির পাশে রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্মশান।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, শ্মশানের জায়গা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ সৃষ্টি না হয়, সে জন্য সরকারি আমিনের মাধ্যমে মাপজোক করে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। চন্দন কুমার চক্রবর্তী ঠাকুর এবং গ্রামের লোকজনের উপস্থিতিতে শ্মশানের জায়গা আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
তাহলে শ্মশানের সীমানা নির্ধারণের পরও যদি কৃষিজমিতে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে এর প্রকৃত কারণ কী?
মাঠে সরেজমিন তদন্ত
অভিযোগের বিষয়টি যাচাই করতে ঘটনাস্থলে সরেজমিনে উপস্থিত হয় সংযোগ বাংলা টিভির প্রতিনিধি দল। একই সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী দুই জন কৃষি কর্মকর্তা।
তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি আশপাশের জমির মালিক, কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন।
তদন্তে উপস্থিত ছিলেন—
উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জনাব মো. নুর ইসলাম
এবং
উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোছা. ফারজানা খাতুন।
সরেজমিন তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ ও স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি আইনগতভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে কর্মকর্তারা মত দেন বলে জানা গেছে।
জমির মালিকদের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন
অনুসন্ধানের সময় জমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাদের কাছে জমি নিয়ে কোনো বিরোধ আছে কি না জানতে চাইলে তারা বিরোধের কথা অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে, বাবু ড্রাইভার অভিযোগের প্রসঙ্গে কাসেম মেম্বারের কথা উল্লেখ করলেও কাসেম মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চাইলে তিনিও বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
অর্থাৎ, একদিকে জমির মালিকরা বলছেন বিরোধ নেই, অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ—জমিতে বারবার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।
তাহলে ঘটনার নেপথ্যে আসলে কে?
এ প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষকের ক্ষতি হলে দায় নেবে কে?
একজন কৃষকের জমির ঘেরা বারবার উপড়ে ফেলা, গাছ নষ্ট করার অভিযোগ কিংবা ফসলের ক্ষতি—এসব কোনোভাবেই ছোট বিষয় নয়।
কারণ কৃষকের জমি শুধু মাটি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার শ্রম, বিনিয়োগ, পরিবারের খাদ্য ও ভবিষ্যতের আশা।
তাই অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে—একজন দুর্বল কৃষকের ক্ষতি করার সাহস কোথা থেকে আসছে?
আর যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাহলেও তদন্তের মাধ্যমে সেটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
পুলিশের তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর
সরেজমিন তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন এবং পার্শ্ববর্তী থানায় অভিযোগ করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করুক। প্রয়োজনে পুনরায় ঘটনাস্থলে গিয়ে জমির সীমানা, ক্ষয়ক্ষতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা যাচাই করা হোক।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকেও রক্ষা করা হোক।
শেষ প্রশ্ন—‘অত্যাচারী কৃষক’ নাকি অন্য কোনো রহস্য?
স্থানীয়দের কেউ কেউ বাবু ও তার ছেলে রাসেলকে ‘অত্যাচারী কৃষক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দাবি করছেন। কিন্তু সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে আসল প্রশ্ন হলো—অভিযোগের আড়ালে প্রকৃত ঘটনা কী?
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। শ্মশানের সীমানাও মাপজোক করে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। তবুও কেন বারবার জমির ঘেরা উপড়ে ফেলার অভিযোগ?
কার নির্দেশে?
কেন?
কী উদ্দেশ্যে?
আর এর পেছনে কি আরও কোনো অদৃশ্য স্বার্থ কাজ করছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখন পুলিশের নিরপেক্ষ তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে।
সংযোগ বাংলা টিভির অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
নিউজ: আব্দুস শুকুর
সম্পাদক | সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
যোগাযোগ: ০১৭২৭০৩৪৬৯০
