চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলায় সাক্ষ্য দিতে নির্ধারিত সময়ে হাজির না হওয়ায় বর্তমানে কর্মরত ও বিভিন্ন ইউনিটে বদলি হওয়া প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবর প্রকাশ্যে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা হলেও, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ করলে এটি মূলত পুলিশ সদস্যদের আসামি হওয়ার ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির না হওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। �
Jagonews24 +১
আসল ঘটনা কী?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব পুলিশ সদস্য বিভিন্ন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা বা অন্য কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। তাদের আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য একাধিকবার সমন ও তাগাদাপত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্তু অনেকেই নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হওয়ায় পর্যায়ক্রমে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। �
Jagonews24
সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে গত ৩ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ১৮টি পৃথক স্মারকে চিঠি পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত তারিখে আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এসব সদস্য বর্তমানে চট্টগ্রামের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা ও বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন। �
Jagonews24 +১
কেন এত পুলিশ সদস্য আদালতে হাজির হতে পারছেন না?
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও পুলিশের বক্তব্যে কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—বদলি, পুরোনো কর্মস্থলে সমন পৌঁছানো, প্রশাসনিক জটিলতা, সময়মতো সমন না পাওয়া, অসুস্থতা এবং কোনো কোনো সাক্ষীর ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করা। বিশেষ করে তদন্ত কর্মকর্তা বা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য বদলি হয়ে অন্য জেলা বা ইউনিটে চলে গেলে আদালতের সঙ্গে নতুন কর্মস্থলের সমন্বয় জটিল হয়ে পড়ে। �
দৈনিক সংগ্রাম +১
সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদও বলেছেন, এসব পুলিশ সদস্য আসামি নন, তারা সাক্ষী এবং আদালতে সাক্ষ্য নিশ্চিত করার জন্যই তাদের তলব করা হয়েছে। �
Jagonews24
তাহলে ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা’ কেন?
আইনের দৃষ্টিতে আদালতের সমন বা নির্দেশ বারবার অমান্য করে সাক্ষী হাজির না হলে আদালত তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। প্রকাশিত সিএমপি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এসব পুলিশ সাক্ষীর ক্ষেত্রে আগে সমন, পরে পরোয়ানা এবং কিছু ক্ষেত্রে জামিন অযোগ্য পরোয়ানার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। �
Jagonews24
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পরোয়ানা জারি হওয়া মানেই ওই ৭০০ পুলিশ সদস্য কোনো অপরাধে অভিযুক্ত বা তারা মামলার আসামি—এমনটি নয়। বরং প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূল বিষয় হলো তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ নিশ্চিত করা।
বিচারব্যবস্থার জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আদালতে হাজির না হলে একটি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে যেতে পারে। এভাবে একের পর এক তারিখ পেছাতে থাকলে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন বিচারপ্রার্থী, বাদী-বিবাদী এবং শেষ পর্যন্ত পুরো বিচারব্যবস্থা।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এর আগেও শত শত পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার জন্য দাপ্তরিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি হঠাৎ তৈরি হয়নি; দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি প্রশাসনিক ও বিচারিক সমন্বয়-সংক্রান্ত সমস্যারও প্রতিফলন এটি। �
Jagonews24
সার্বিক পর্যবেক্ষণ
৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে পরোয়ানার খবরটি চাঞ্চল্যকর হলেও এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো উচিত নয়। এটিকে সরাসরি ‘৭০০ পুলিশ অপরাধ করেছে’ বা ‘৭০০ পুলিশকে আসামি করা হয়েছে’—এভাবে উপস্থাপন করা তথ্যগতভাবে বিভ্রান্তিকর হবে।
বরং ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় পুলিশ সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে? বদলির পরও কীভাবে একজন তদন্ত কর্মকর্তা বা সাক্ষীকে দ্রুত আদালতে হাজির করা যায়, সে বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা এবং প্রকৃত কারণ ছাড়া সাক্ষ্য দিতে অনুপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে শুধু আদালত নয়, তদন্তকারী সংস্থা, রাষ্ট্রপক্ষ এবং সাক্ষী—সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
সুতরাং, ‘৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা’—এই শিরোনামের আড়ালের মূল বিষয় হলো দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন মামলায় পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতি এবং তাদের আদালতে হাজিরা নিশ্চিত করার উদ্যোগ।

You missed