একটি কষ্টের গল্প, যেখানে অভিমান, অসুস্থতা আর একাকিত্বের কাছে হার মানে সংসারের হাসি।
মধুপুরের রাজা কৈমুদ্দিন। আর কুচিয়ামারার বেগম রানী।
একসময় তাঁদের সংসার ছিল স্বপ্নের মতো। নতুন বউ, নতুন ঘর, নতুন জীবনের কত আয়োজন! রাজা কৈমুদ্দিনের চোখে তখন ভবিষ্যতের কত স্বপ্ন—একদিন তাঁদের ঘরেও আসবে সন্তান, উঠানে ছোট্ট পায়ের শব্দ হবে, সংসার ভরে উঠবে হাসি-আনন্দে।
কিন্তু সময় কারও স্বপ্নের হিসাব রাখে না।
দাম্পত্য জীবনের যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু পেরিয়ে গেলেও তাঁদের সংসারে এলো না কোনো সন্তান। ধীরে ধীরে সেই অপূর্ণতা দুজনের মনের ভেতর জমতে লাগল অভিমান হয়ে।
একদিন কথার ছলে রাজা কৈমুদ্দিন বললেন,
—“বেগম, আমাদের ঘরে সন্তান না আসার পেছনে হয়তো তোমার কোনো শারীরিক সমস্যা আছে।”
কথাটি রানীর হৃদয়ে যেন কাঁটার মতো বিঁধল। তিনি চুপ করে থাকলেন না। কষ্ট আর অভিমানে পাল্টা বললেন,
—“রাজা, সব দোষ কি আমার? তোমার সমস্যার কারণেও তো আমাদের ঘরে সন্তান আসছে না!”
সেদিনের কথাকাটাকাটি হয়তো অন্য দিনের মতোই শেষ হতে পারত। কিন্তু কিছু কথা মানুষের মনে এমন দাগ কাটে, যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না—বরং আরও গভীর হয়।
এরপর থেকে তাঁদের সংসারে হাসির চেয়ে নীরবতা বাড়তে লাগল।
রানী বাপের বাড়ি গেলে আর সহজে ফিরতে চাইতেন না। ফিরলেও কয়েক দিনের বেশি থাকতেন না। আনুমানিক ১০ দিন রাজার বাড়িতে, আর প্রায় তিন মাস বাপের বাড়িতে—এমন এক অদ্ভুত নিয়ম যেন তাঁদের সংসারের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াল।
এলাকার মানুষও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন করতে শুরু করল।
“রাজা-রানী কি সত্যিই একসঙ্গে সংসার করছেন?”
“দুজন দুই জায়গায় থাকেন কেন?”
“অসুস্থ রাজা কৈমুদ্দিন একা কীভাবে থাকেন?”
“কে তাঁর রান্না করে? কে তাঁর খোঁজ রাখে?”
প্রশ্নের শেষ নেই। কিন্তু উত্তর যেন কারও জানা নেই।
অন্যদিকে রাজা কৈমুদ্দিনের শরীর দিন দিন শুকিয়ে যেতে লাগল। অসুস্থতা, একাকিত্ব আর অনিয়মিত খাওয়াদাওয়ার কারণে তাঁকে দেখে অনেকেরই মায়া হতো।
কখনো পাশের বাড়ির ভাই-ভাবি কিছু খাবার দিলে তিনি খেতেন। কখনো ভাবিকে দিয়ে রান্না করিয়ে নিতেন। একবার রান্না করা খাবার দিয়েই দুই-তিন দিন চলে যেত।
কখনো খাবার জুটত, কখনো জুটত না।
একসময় যে মানুষটি সংসারের স্বপ্ন দেখতেন, সেই রাজা কৈমুদ্দিনকে এখন দেখা যায় একা বসে থাকতে। ঘরের নীরবতা যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে। চুলার পাশে পড়ে থাকে রান্নার বাসন। উঠানে পড়ে থাকে দিনের পর দিন জমে থাকা একাকিত্ব।
গ্রামের মানুষ দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। কেউ সহানুভূতি প্রকাশ করে, কেউ নানা প্রশ্ন তোলে। কিন্তু রাজার বুকের ভেতরের কষ্ট কতটা গভীর, তা কি কেউ সত্যিই জানে?
কিছুদিন পর রানী আবার ফিরে আসেন। কয়েক দিন থাকেন। তারপর আবার চলে যান বাপের বাড়ি।
কখনো কোনো জিনিস বিক্রি হলে হিসাব-নিকাশের প্রয়োজনে রাজার কাছে আসেন। হিসাব শেষ হলে আবার চলে যান।
এমন দৃশ্য দেখে মানুষের মনে আরও নানা প্রশ্ন জাগে।
তবে কি তাঁদের সংসারে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে?
নাকি অভিমানই তাঁদের দূরে সরিয়ে রেখেছে?
নাকি এমন কোনো বাস্তব সমস্যা আছে, যা তাঁরা কাউকে বলতে পারেন না?
কেউ কেউ নানা সন্দেহের কথা বলেন। কিন্তু সত্যিটা কী—তা রাজা কৈমুদ্দিন ও বেগম রানী ছাড়া আর কে জানেন?
সংসার শুধু একই ঘরে থাকার নাম নয়। সংসার মানে অসুস্থতার দিনে পাশে থাকা, অভিমানের পরও কথা বলা, একে অপরের কষ্ট বোঝা এবং প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
সন্তান না হওয়া কোনো দাম্পত্য জীবনের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। আর শারীরিক সমস্যা থাকলেও তা নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ না করে চিকিৎসা, পরামর্শ ও পারস্পরিক সহযোগিতার পথ খোঁজা জরুরি।
কারণ, একজন অসুস্থ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু ওষুধ নয়—প্রয়োজন একজন আপন মানুষ, যে বলবে,
“তুমি একা নও, আমি আছি।”
রাজা কৈমুদ্দিনের জীবনের এই দৃশ্য আজও গ্রামের মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগায়। কিন্তু প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি মানবিক বিষয়—
একজন অসুস্থ মানুষ কতটা একা হয়ে গেলে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো আপনজনও দূরে সরে যায়?
আর একটি সংসার কতটা অভিমানে ভরে গেলে স্বামী-স্ত্রী একই সম্পর্কের নাম বহন করেও দুই দেশে বসবাস করেন?
এই গল্পের শেষ উত্তর হয়তো আজও অজানা।
তবে রাজা ও রানীর জীবনের দিকে তাকিয়ে আমাদের সবার জন্য একটি শিক্ষা রয়েছে—
অভিমান হোক, কিন্তু সম্পর্কের দরজা যেন পুরোপুরি বন্ধ না হয়।
কষ্ট থাকুক, কিন্তু অসুস্থ মানুষ যেন একা না থাকে।
আর সংসারে সমস্যা এলে দোষারোপ নয়, প্রয়োজন হোক বোঝাপড়া ও সমাধানের চেষ্টা।
আপনাদের কী মনে হয়—রাজা কৈমুদ্দিন ও বেগম রানীর এই দূরত্বের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? মতামত কমেন্টে জানাতে পারেন।
লেখক: আব্দুস শুকুর
সম্পাদক: সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
যোগাযোগ: ০১৭২৭০৩৪৬৯০

You missed