নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
যোগাযোগ: 01727034690
সমাজে অন্যায়, অবিচার কিংবা অপরাধের ঘটনা ঘটলে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই অন্যায়ের জবাব দিতে গিয়ে যদি আরেকটি অন্যায় করা হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং একটি অপরাধের সঙ্গে আরেকটি অপরাধ যুক্ত হয়। এ কারণেই বলা যায়—প্রতিশোধ অনেক সময় ন্যায়বিচার নয়, বরং দ্বিতীয় অন্যায়ের সূচনা।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি অন্যায়ভাবে আরেকজনের ক্ষতি করলেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একই ধরনের বা আরও বড় অন্যায় করলেন। তখন প্রথম অন্যায়টি মুছে যায় না। বরং হিসাব দাঁড়ায়—একটি অন্যায় ছিল, প্রতিশোধের মাধ্যমে তা দুইটি অন্যায়ে পরিণত হলো। এরপর উভয়পক্ষ নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্য প্রমাণ করার চেষ্টা করতে থাকে এবং বিরোধ আরও গভীর হয়।
প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচার এক বিষয় নয়
প্রতিশোধের লক্ষ্য সাধারণত অপর পক্ষকে শাস্তি দেওয়া বা কষ্ট দেওয়া। অন্যদিকে ন্যায়বিচারের লক্ষ্য হলো সত্য উদঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং আইন ও নীতির ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
অর্থাৎ কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা, প্রমাণ উপস্থাপন করা এবং আইনগত বা ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ায় বিচার চাওয়া এক বিষয়। আর নিজ হাতে শাস্তি দিতে যাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেই অন্যায় করা—দুটিকে এক করে দেখলে ন্যায়বোধ দুর্বল হয়ে যায়।
অপরাধ দেখা আর অপরাধ করা এক নয়
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—অপরাধ ও অপরাধী এক বিষয় নয়।
একজন মানুষ একটি অপরাধ প্রত্যক্ষ করতে পারেন। তিনি দেখতে পারেন যে একটি কাজ অন্যায় বা বেআইনি। কিন্তু তিনি নিজে সেই কাজে অংশ নাও নিতে পারেন। অর্থাৎ তিনি অপরাধটি দেখেছেন, কিন্তু অপরাধ করেননি।
অন্যদিকে কেউ যখন জানেন বা বোঝেন যে একটি কাজ অন্যায়, ক্ষতিকর কিংবা অপরাধমূলক, তারপরও জেনে-শুনে সেই কাজটি করেন, তখন তার নিজের কর্মের জন্য দায় সৃষ্টি হতে পারে। এখানেই অপরাধের ঘটনা এবং অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তি—এই দুইটি ধারণাকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
অপরাধীকে ঘৃণা নয়, অপরাধের বিচার গুরুত্বপূর্ণ
কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন বলেই তার প্রতিটি কাজ অপরাধ হয়ে যায় না; আবার কোনো ব্যক্তি ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত বলেই তার অন্যায় কাজ বৈধ হয়ে যায় না। বিচার হওয়া উচিত কাজের ভিত্তিতে, প্রমাণের ভিত্তিতে এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায়।
এ কারণে আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রতিশোধের নামে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নিজের হাতে তুলে নেওয়াও বিপজ্জনক।
প্রতিশোধ কেন অপরাধের সংখ্যা বাড়ায়?
প্রথম অন্যায়ের পর যদি প্রতিশোধ নেওয়া হয়, তখন বিরোধ সাধারণত এখানেই শেষ হয় না। প্রতিপক্ষ আবার পাল্টা প্রতিশোধ নিতে পারে। এভাবে একটি ঘটনা থেকে আরেকটি ঘটনা, একটি আঘাত থেকে আরেকটি আঘাত, একটি মামলা থেকে আরেকটি মামলা—সংঘাত ক্রমেই বাড়তে থাকে।
ফলে যে সমস্যার শুরু হয়েছিল একজনের অন্যায় দিয়ে, সেটি পরবর্তীতে দুই পক্ষের সংঘাত, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক বিভাজন কিংবা দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতায় রূপ নিতে পারে।
প্রতিশোধ না নেওয়াটাই কি সবসময় ভালো?
অন্যায় সহ্য করে চুপ থাকা এবং প্রতিশোধ না নেওয়া এক বিষয় নয়। একজন ব্যক্তি প্রতিশোধ না নিয়েও নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। তিনি আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন, সামাজিকভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন, প্রমাণ সংরক্ষণ করতে পারেন এবং ন্যায়বিচারের দাবি তুলতে পারেন।
অর্থাৎ প্রতিশোধ পরিহার করা দুর্বলতা নয়; বরং অন্যায়ের জবাব বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত পথে দেওয়াই পরিণত মানসিকতার পরিচয়।
শেষ কথা
একজন অন্যায় করেছে—এটি একটি সমস্যা। সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরেকজন অন্যায় করল—তাহলে সমস্যার সমাধান হলো না; অন্যায়ের পরিমাণ আরও বাড়ল।
তাই সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত—
“অন্যায়ের বিচার চাই, কিন্তু অন্যায়ের প্রতিশোধ নয়।”
কারণ অপরাধের জবাব আরেকটি অপরাধ দিয়ে দিলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং অপরাধ কমানোর পরিবর্তে অপরাধের ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। ন্যায়বিচারের পথ হলো সত্য, প্রমাণ, সংযম এবং বৈধ প্রক্রিয়া। আর প্রতিশোধের পথ অনেক সময় মানুষকে সেই অন্যায়ের চক্রেই আটকে রাখে, যেখান থেকে বের হয়ে আসাই ছিল প্রকৃত বিজয়।

You missed