নিজস্ব প্রতিবেদক: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি | সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, গণআন্দোলন ও স্বাধীনতার গৌরবে সমৃদ্ধ। একই সঙ্গে এই ইতিহাসের কিছু অধ্যায় রক্তাক্ত, বেদনাদায়ক এবং গভীর রাজনৈতিক বিভাজনে পরিপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংঘাত, রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন, হত্যাকাণ্ড, বিচার ও পাল্টা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেশের সমাজ ও রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
আজও প্রশ্ন ওঠে—এই প্রতিহিংসার রাজনীতি কোথা থেকে শুরু হয়েছিল? আর এর শেষ কোথায়?
মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগের উত্থান—ইতিহাস কী বলে?
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববাংলার রাজনীতিতে মুসলিম লীগ ছিল অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু সরকারের নীতি, ভাষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে মুসলিম লীগের ভেতরের একটি অংশ আলাদা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলে।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন এর সভাপতি। পরবর্তী সময়ে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই রাজনৈতিক ধারার অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে ধীরে ধীরে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শিকড়ের সঙ্গে মুসলিম লীগের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও এটিকে সরলভাবে ‘মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ’ বললে ইতিহাসের জটিলতা আড়াল হয়ে যায়।
স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার দেশ পরিচালনা করছিল।
১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হয় এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল—গঠিত হয়। একই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটপূর্ণ।
এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে একদল সেনা কর্মকর্তা হত্যা করেন। ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি।
কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল—এর ব্যাখ্যায় রাজনৈতিক সংকট, সামরিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনসহ একাধিক কারণ নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ রয়েছে। তাই ঘটনাটিকে শুধু একটি কারণ বা একটি দলের প্রতিশোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
এরপর জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড।
জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি—প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় তিনি নিহত হন।
দুটি হত্যাকাণ্ডই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করে। তবে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে সরাসরি ‘একটির প্রতিশোধ হিসেবে আরেকটি’ বলা ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়। বরং উভয় ঘটনাই নিজ নিজ সময়ের রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয়েছিল।
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে আওয়ামী লীগের মতো মুসলিম লীগ থেকে উৎপন্ন দল হিসেবে দেখানোও ইতিহাসসম্মত নয়।
মাওলানা সাইয়্যিদ আবুল আ’লা মওদূদী ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পর সংগঠনটি ভারত ও পাকিস্তানভিত্তিক পৃথক কাঠামোয় বিভক্ত হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির কয়েকজন নেতা ও সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। স্বাধীনতার পর জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়; পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় ১৯৭৯ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর জামায়াত আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে আসে।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয় এবং কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এসব বিচারকে কেউ মুক্তিযুদ্ধের অপরাধের বিচার হিসেবে দেখেছেন, আবার রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। তাই ঘটনাগুলোকে কেবল ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে অভিহিত না করে বিচার, অভিযোগ, আদালতের রায় এবং রাজনৈতিক বিতর্ক—সবগুলো দিক বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে?
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি অতীতের সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়েছি?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির নিজস্ব আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থান থাকতে পারে। কিন্তু মতের পার্থক্য যেন সহিংসতা, হত্যা, প্রতিহিংসা, নিপীড়ন কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়—সেটিই হওয়া উচিত সবার প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গ্রহণ করা গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি?
আজকের প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই?
এমন বাংলাদেশ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে?
নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে মতের অমিল থাকবে, কিন্তু মানুষ কথা বলার অধিকার রাখবে; রাজনৈতিক বিরোধ থাকবে, কিন্তু হত্যার রাজনীতি থাকবে না; অপরাধ হলে দল-মত নির্বিশেষে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের মাধ্যমে বিচার হবে?
ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধ, পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত ও বিচার—সবকিছুই বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—অতীতের রক্তাক্ত অধ্যায়কে ভবিষ্যতের প্রতিহিংসার কারণ না বানিয়ে সেখান থেকে রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কারের শিক্ষা নেওয়া।
বাংলাদেশ কারও একার নয়। এই দেশ আওয়ামী লীগের যেমন, বিএনপির সমর্থকেরও; জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক মতের মানুষেরও। সর্বোপরি বাংলাদেশ সাধারণ মানুষের।
তাই প্রতিশোধের রাজনীতি নয়—প্রয়োজন ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জাতীয় ঐক্য।
অন্ধকারের প্রতিহিংসার আগুন থেকে মুক্ত হয়ে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রত্যাশা—যেখানে আগামী প্রজন্ম রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং একজন নাগরিক হিসেবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।
নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
যোগাযোগ: 01727034690

You missed