পটুয়াখালী সদর উপজেলার চর জৈনকাঠী এলাকায় অটোচালক মোঃ জাকারিয়া শরীফ (২৮) হত্যা ও তার অটোর ব্যাটারি ছিনতাইয়ের ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চর জৈনকাঠী শৌলা খেয়াঘাট সংলগ্ন লোহালিয়া নদীতে এক ব্যক্তির মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। খবর পেয়ে পটুয়াখালী সদর থানা পুলিশের মোবাইল টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ঘটনাস্থল নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রাখে।
পরে পটুয়াখালী সদর থানা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), নৌ পুলিশ, সিআইডি, পিবিআইসহ পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। পরে মরদেহটি অটোচালক মোঃ জাকারিয়া শরীফের বলে শনাক্ত করেন তার পরিবারের সদস্যরা।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, জাকারিয়াকে চিকন তার বা ক্যাবল দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা মোঃ রুহুল আমিন শরীফের অভিযোগের ভিত্তিতে ১০ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী থানায় মামলা নম্বর-২৯, দণ্ডবিধির ৩০২/৩৭৯/২০১/৩৪ ধারায় মামলা করা হয়।
মামলার তদন্তে পুলিশ পটুয়াখালী শহর ও আশপাশের এলাকার শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও গোপন তথ্য সংগ্রহের পর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মোঃ সাইফুল ইসলাম (২৯) ও মোঃ মামুন হাওলাদারের (২৯) সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। এছাড়া চোরাই ব্যাটারি কেনার অভিযোগে মোঃ শুক্কুর আকন (৪৫)-এর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে ২৬ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযান চালিয়ে সাইফুল ইসলামকে গাজীপুর জেলা থেকে, মামুন হাওলাদারকে পটুয়াখালী সদর এলাকা থেকে এবং শুক্কুর আকনকে মহিপুর থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাইফুল ইসলাম জানান, নিহত জাকারিয়ার সঙ্গে তার পূর্বপরিচয় ছিল। মাদকসংক্রান্ত আর্থিক বিরোধের জেরে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর সাইফুল ও মামুন জাকারিয়াকে হত্যার পাশাপাশি তার অটোর ব্যাটারি চুরির পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাইফুল ফোন করে জাকারিয়াকে চৌরাস্তা এলাকায় ডেকে নেন। পরে একটি মাদক চালান আনার কথা বলে জাকারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সাইফুল ও মামুন সিএনজিযোগে জৈনকাঠী খেয়াঘাট এলাকায় যান।
সেখানে যাওয়ার সময় সাইফুলের কাছে একটি ক্যাবল ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। খেয়াঘাট এলাকায় তিনজনের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সাইফুল ক্যাবল দিয়ে জাকারিয়ার গলায় পেঁচিয়ে ধরেন এবং মামুন তার পা চেপে ধরেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে জাকারিয়ার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ লোহালিয়া নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানায়।
এরপর জাকারিয়ার অটোটি নিয়ে বিসিক শিল্প এলাকার পশ্চিম পাশে নদীর পাড়ে গিয়ে তিনটি ব্যাটারি খুলে নেওয়া হয়। অপর একটি ব্যাটারি খোলার সময় মোটরসাইকেল আসতে দেখে সেটি রেখে অটোরিকশাটি নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, পরে তিনটি ব্যাটারি মহিপুর এলাকায় নিয়ে গিয়ে শুক্কুর আকনের কাছে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। পরবর্তীতে ওই টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন সাইফুল ও মামুন।
তদন্তের একপর্যায়ে বিসিক শিল্প এলাকা থেকে নিহতের অটো এবং একটি ব্যাটারি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে শুক্কুর আকনের কাছ থেকে চোরাই যাওয়া তিনটি ব্যাটারিও উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গ্রেপ্তার তিনজন
১. মোঃ সাইফুল ইসলাম (২৯) — পটুয়াখালী
২. মোঃ মামুন হাওলাদার (২৯) — পটুয়াখালী
৩. মোঃ শুক্কুর আকন (৪৫) — মহিপুর, পটুয়াখালী
পুলিশের তথ্যমতে, সাইফুল ও মামুন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং শুক্কুর চোরাই ব্যাটারি কেনার কথা স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
এ ঘটনায় একটি অটো, চোরাই যাওয়া তিনটি ব্যাটারি এবং হত্যাকাণ্ড ও চুরির কাজে ব্যবহৃত সিএনজি জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে মামলার তদন্ত এখনো চলমান। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত বা সহযোগিতা করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
নিউজ প্রতিনিধি
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম

You missed