নীল জার্সি, বিশ্বকাপ ট্রফি এবং পিৎজা আর রোমান স্থাপত্য—এই পরিচয়েই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ইতালি। কিন্তু ক্রিকেটের ইতালির কথা কতজন জানেন? একদম ডাইহার্ড ক্রিকেটভক্ত ছাড়া হয়তো অনেকেরই অজানা ইতালিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে।

ফুটবলের সেই ইতালিই ক্রিকেটে লিখেছে নতুন ইতিহাস। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অভিষেক আসরে প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ৭৩ রানে হার দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল তারা।অনেকেই ভেবেছিলেন, বিশ্বমঞ্চের চাপ হয়তো সামলাতে পারবে না নবাগত দলটি। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই বদলে যায় দৃশ্যপট। হিমালয়ের দেশ নেপালকে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নেয় চারবারের ফুটবল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নদের দেশ।

বহুজাতিক দল ইতালি
ইতালির ১৫ সদস্যের স্কোয়াড বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি এক ভিন্নধর্মী দল।জন্মসূত্রে ইতালিয়ান কেউ নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বংশোদ্ভূত ক্রিকেটাররা এক পতাকার নিচে একত্রিত হয়েছেন। কেউ পারিবারিক সূত্রে ইতালিয়ান নাগরিকত্ব পেয়েছেন, কেউ বিবাহসূত্রে। ভিন্ন ভৌগোলিক শিকড় হলেও মাঠে তাদের পরিচয় তারা ইতালিয়ান। 

ইউরোপের বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূল আসরে জায়গা করে নেওয়া এই দল দীর্ঘদিন ধরেই একসঙ্গে খেলছে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে এসে তারা একত্রিত হন, অনুশীলন করেন, বাছাইপর্বে অংশ নেন। এই ধারাবাহিক প্রস্তুতির ফলই মিলেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে।

পেশা ভিন্ন, লক্ষ্য এক
ইতালির ক্রিকেটারদের গল্পে আছে সংগ্রামের ছাপ। শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভূত লেগ স্পিনার কৃষাণ কালুগামাগে কৈশোরেই ইতালিতে পাড়ি জমান।জীবিকার প্রয়োজনে পিৎজা প্রস্তুতকারক হিসেবে কাজ করলেও ক্রিকেট ছাড়েননি। মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম তার নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়েই নেপালের ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙ্গে পড়ে। 
নেপালের দেওয়া ১২৪ রান তাড়া করতে নেমে উদ্বোধনী জুটি গড়েন দুই ভাই জাস্টিন ও অ্যান্থনি মস্কা। দু’জনই অস্ট্রেলিয়ায় বেড়ে ওঠা। জাস্টিন একটি স্কুলে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক, অ্যান্থনি কাজ করেন কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে। তবে ব্যাট হাতে নিতেই তারা বদলে ফেলেন নিজেদের পেশা, হয়ে উঠেন জাত ব্যাটসম্যান। বৃহস্পতিবার এই দুইজনের আগ্রাসী ব্যাটিংই ১০ উইকেটের বড় জয় এনে দিয়েছে ইতালিকে।

দলের আরেক সদস্য জাসপ্রীত সিং। যিনি ভারতে জন্ম নিলেও বেড়ে উঠেছেন ইতালিতে। ক্রিকেট তার নেশা, পেশায় তিনি উবার চালক। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জাইন আলি পেশায় প্রকৌশলী। কয়েকজন সদস্য কারখানায় কাজ করেন; বিশ্বকাপ খেলতে তারা বিশেষ ছুটি নিয়ে ভারতে এসেছেন।

অভিজ্ঞতার ছোঁয়াও আছে
শুধু অপেশাদার ক্রিকেটারদের সমন্বয়েই যে ইতালি দল গঠিত হয়েছে তেমনটা নয়, অভিজ্ঞতাও রয়েছে ইতালির দলে। ম্যাডসেন ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্লাব ডার্বিশায়ারের হয়ে নিয়মিত খেলে থাকেন। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে পরিচিত মুখ দুই ভাই হ্যারি ও বেন মানেন্তি। পারিবারিক সূত্রে ইতালিয়ান নাগরিকত্ব পাওয়ায় তারা ইতালির হয়ে খেলছেন। এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপস্থিতি দলকে ভারসাম্য এনে দিয়েছে।

ফুটবলের আড়ালে নতুন সম্ভাবনা
ফুটবলে ইতালি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ফুটবলে ঐতিহ্য বহমান থাকলেও ২০০৬ সালের পর বিশ্বকাপে তাদের সাফল্য কমে গেছে। ২০১৮ ও ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা দেশটির ক্রীড়াঙ্গনে হতাশা তৈরি করেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ক্রিকেটে এই অর্জন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

একটি জয়ের তাৎপর্য
ক্রিকেট ইতালিতে এখনও মূল খেলা নয়। অভিষেক বিশ্বকাপেই জয় পাওয়া যে কোনো দলের জন্য বড় প্রাপ্তি। ইতালির ক্ষেত্রে এটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দলটির প্রতিটি ক্রিকেটার ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা থেকে উঠে এসেছেন। পেশাগত দায়িত্ব, সীমিত অনুশীলন সুবিধার মতো সব বাধা অতিক্রম করে তারা বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফুটবলের ঐতিহ্যের আড়ালে ক্রিকেটে ইতালির এই উত্থান তাই নিছক পরিসংখ্যান নয়। এটি বহুসংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়া এক দলের সাফল্য। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এবং নেপালের বিপক্ষে এই জয়টি নিশ্চিত ভাবেই ভবিষ্যতে ইতালির ক্রিকেটের বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আরআইআর/আরইউ

By mgmynul

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You missed