পাবনা প্রতিনিধি: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
যোগাযোগ: 01727034690
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম একটি গভীরভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুদণ্ড এবং পরবর্তী মৃত্যু আজও রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য দায়ী কে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগের বাইরে গিয়ে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন, বিচারব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকাতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধের বিচার হয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিচার, রায় এবং দণ্ড কার্যকর—সবকিছুই নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা।
সাঈদীর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয় এবং পরবর্তীতে আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে তাঁর দণ্ড নির্ধারিত হয়। তবে তাঁর বিচারপ্রক্রিয়া ও রায় নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা বিতর্ক ও মতভেদও ছিল।
এখানেই সামনে আসে আরও বড় একটি প্রশ্ন—রাষ্ট্রের আইন ও সরকার পরিচালনার ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত আসে কোথা থেকে?
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের আইন ও নীতি নির্ধারণের সাংবিধানিক কাঠামো পরিচালিত হয়।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে ভোট দিই, তখন সেই ভোটের মাধ্যমে গঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব কতটুকু?
এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে নয়। কারণ বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন। রাষ্ট্রের আইন সবার জন্য প্রযোজ্য এবং নাগরিকের অধিকারও সবার সমান হওয়া উচিত।
সুতরাং “সাঈদীর মৃত্যুর জন্য মুসলিমরাই দায়ী”—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তথ্যভিত্তিক হবে না। বরং বলা যায়, এটি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে আত্মসমালোচনার একটি বিষয়।
আমরা যে দল-মতের মানুষই হই না কেন, আমাদের মনে রাখতে হবে—ভোট শুধু একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার বিষয় নয়; ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনাও নির্ধারিত হয়।
তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত—
আমরা কাকে ভোট দিয়েছিলাম?
কেন ভোট দিয়েছিলাম?
আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কী আইন ও নীতি গ্রহণ করেছিলেন?
আর সেই সিদ্ধান্তের প্রতি একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্বই বা কতটুকু?
আল্লামা সাঈদীর বিচার ও মৃত্যুকে ঘিরে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দোষারোপ না করে বরং আমাদের গণতন্ত্র, আইন, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক সচেতনতা নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।
কারণ শেষ পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান—পরিচয়ের আগে আমরা সবাই মানুষ এবং একই রাষ্ট্রের নাগরিক।
সাঈদীর ঘটনাটি তাই শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়; এটি আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়—
রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের জন্য শুধু শাসকদের দিকে তাকাব, নাকি নিজেদের ভোট ও নাগরিক সিদ্ধান্তের দিকেও তাকাব?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

You missed