শেখ মুজিবের ভাস্কর্য ভাঙা থেকে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ—ইতিহাস, ধর্ম ও রাজনীতির মাঝখানে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন
অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ | আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি | সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভাস্কর্য, মূর্তি, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুর হয়েছে, অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।
এখানেই সাধারণ মানুষের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—
যদি ভাস্কর্য বা মূর্তি ধর্মীয় কারণে নাজায়েজ হয়ে থাকে, তাহলে জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভের ক্ষেত্রে সেই নীতি কি প্রযোজ্য নয়?
আর যদি স্মৃতি সংরক্ষণ ও ইতিহাস তুলে ধরার জন্য স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ বৈধ বা গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে অতীতের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের স্মারক স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার যুক্তিটি কী ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়—ইতিহাস, আইন, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির আলোকে খোঁজা প্রয়োজন।
পর্ব–১ : শেখ মুজিবের ভাস্কর্য ভাঙচুর—ঘটনাটি কী?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ঢাকার বিজয় সরণির ‘মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণ’-এ থাকা শেখ মুজিবের ভাস্কর্যও ভাঙচুর করা হয়।
এই ভাঙচুরকে কেউ দেখেছেন রাজনৈতিক প্রতীক ভাঙার ঘটনা হিসেবে, কেউ দেখেছেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যক্তিপূজার বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে। আবার কেউ কেউ ধর্মীয় যুক্তিতে মূর্তি-ভাস্কর্যের বিরোধিতা করেছেন।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং ধর্মীয় আপত্তি একই বিষয় নয়।
কোনো ভাস্কর্য ভাঙার পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকলে সেটিকে ধর্মীয় বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি ধর্মীয় আপত্তিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার বানানোও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
পর্ব–২ : জুলাই শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ কেন নির্মাণ করা হলো?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালে দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।
রাজশাহীতেও সিঅ্যান্ডবি মোড়ে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অর্থাৎ রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল—জুলাই আন্দোলনের নিহতদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঘটনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি:
স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ মানেই সেটি কোনো ব্যক্তির উপাসনার জন্য তৈরি—এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি টানা যায় না।
স্মৃতিস্তম্ভের উদ্দেশ্য, নকশা, সেখানে কী ধরনের অবয়ব আছে এবং কীভাবে সেটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
পর্ব–৩ : মূর্তি, ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ কি একই জিনিস?
সাধারণ আলোচনায় ‘মূর্তি’, ‘ভাস্কর্য’, ‘ম্যুরাল’ ও ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ শব্দগুলো অনেক সময় একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু স্থাপত্য ও শিল্পকলার দৃষ্টিতে এগুলো এক নয়।
কোনো ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ অবয়বের ভাস্কর্য এক ধরনের শিল্পকর্ম। আবার কোনো আন্দোলন বা যুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরতে বিমূর্ত স্থাপত্য বা প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ভিন্ন বিষয়।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য বহু স্মারক ও ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য’ একজন নিহত ছাত্রের স্মৃতিকে ধারণ করে।
তাই সব ধরনের স্থাপনা একই শ্রেণির—এমন সরল সিদ্ধান্ত তথ্যভিত্তিক নয়।
পর্ব–৪ : ইসলাম কি সব ধরনের ভাস্কর্যকে একইভাবে নিষিদ্ধ করে?
এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ধর্মীয় প্রশ্ন। এখানে রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে স্বীকৃত আলেম ও ইসলামী গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
ইসলামী ঐতিহ্যে প্রাণীর অবয়ববিশিষ্ট মূর্তি নিয়ে কঠোর আপত্তির ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে, বিশেষ করে যখন তা উপাসনা বা উপাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। তবে শিল্পকর্ম, স্মৃতিচিহ্ন, শিক্ষামূলক উপস্থাপনা, স্থাপত্য ও পূজার উদ্দেশ্যে মূর্তি—সবকিছুকে এক বাক্যে একই বিধানের আওতায় ফেলা নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে ব্যাখ্যাগত পার্থক্য রয়েছে।
সুতরাং শুধু রাজনৈতিক অবস্থান দেখে—
“শেখ মুজিবের ভাস্কর্য হারাম, কিন্তু জুলাই যোদ্ধাদের ভাস্কর্য হালাল”
—এমন কোনো সর্বজনীন ধর্মীয় সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
কোনো নির্দিষ্ট স্থাপনা শরিয়াহসম্মত কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হলে তার অবয়ব, উদ্দেশ্য, ব্যবহার এবং ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে যোগ্য আলেমের নির্দিষ্ট ফতোয়া প্রয়োজন।
পর্ব–৫ : বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম—তাহলে কি ভাস্কর্য নিষিদ্ধ?
এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য আছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম”; একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মের সমান মর্যাদা ও ধর্ম পালনের সমান অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হওয়া এবং দেশে কোনো নির্দিষ্ট শিল্পকর্ম বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা—এই দুটি বিষয়কে সরাসরি এক করে ফেলা যায় না।
কোনো ভাস্কর্য ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য কি না—এটি একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যার প্রশ্ন।
আর কোনো স্থাপনা রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মাণ করা আইনসঙ্গত কি না—এটি আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন।
দুটিকে এক করে দেখলে বিতর্ক আরও জটিল হয়ে যায়।
পর্ব–৬ : তাহলে সাধারণ মানুষের মূল প্রশ্ন কোথায়?
সাধারণ মানুষের প্রশ্নটি মূলত নীতির সামঞ্জস্য নিয়ে।
যদি বলা হয়—
“ভাস্কর্য পাপ, তাই ভেঙে দেওয়া হয়েছে”
তাহলে প্রশ্ন উঠবে—পরবর্তীতে নতুন কোনো অবয়ব বা ভাস্কর্য নির্মাণের ক্ষেত্রে একই ধর্মীয় নীতি কেন প্রয়োগ হবে না?
আবার যদি বলা হয়—
“এগুলো পূজার জন্য নয়, ইতিহাস স্মরণ করার জন্য”
তাহলে একই যুক্তি অতীতের অন্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বা ঘটনাকে স্মরণ করা স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রেও সমানভাবে বিবেচনা করা উচিত কি না—সেটিও একটি যৌক্তিক প্রশ্ন।
নীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একই মানদণ্ড সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা।
পর্ব–৭ : রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ভাস্কর্যের সম্পর্ক
বাংলাদেশে ভাস্কর্য নিয়ে বিতর্কের একটি বড় অংশ আসলে ধর্মীয় নয়—রাজনৈতিক।
কোনো সরকারের সময়ে একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণ করা হলো। সরকার পরিবর্তনের পর সেটি ভেঙে ফেলা হলো। আবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলো।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—
আমরা কি ইতিহাস সংরক্ষণ করছি, নাকি ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের প্রতীকও বদলে দিচ্ছি?
ইতিহাসের কোনো অধ্যায় অপছন্দ হলেই সেটিকে মুছে ফেলা যায় না। আবার কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতাও নেই।
গণতান্ত্রিক সমাজে ইতিহাসের ভালো-মন্দ, সাফল্য-ব্যর্থতা—সবই সংরক্ষণ করা উচিত।
পর্ব–৮ : ইতিহাস সংরক্ষণের বিকল্প কি নেই?
অবশ্যই আছে।
জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য শুধু ভাস্কর্য নির্মাণই একমাত্র পথ নয়। সংরক্ষণ করা যেতে পারে—
১. জাতীয় ও আঞ্চলিক জাদুঘরের মাধ্যমে।
২. সরকারি ও বেসরকারি আর্কাইভে।
৩. প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার ধারণ করে।
৪. ছবি, ভিডিও ও সংবাদ প্রতিবেদন সংরক্ষণ করে।
৫. পাঠ্যবই ও গবেষণাগ্রন্থে তথ্যভিত্তিক ইতিহাস তুলে ধরে।
৬. নিহত ও আহতদের যাচাই করা তথ্যের ডাটাবেজ তৈরি করে।
৭. ডিজিটাল আর্কাইভ ও অনলাইন মিউজিয়াম তৈরি করে।
সম্প্রতি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ ও শহীদদের স্মরণে গণভবনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করা হয়েছে।
এ ধরনের জাদুঘর ও আর্কাইভ ইতিহাস সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
পর্ব–৯ : তাহলে কি জুলাই শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ভুল?
এ প্রশ্নের উত্তরও সরলভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা ঠিক হবে না।
কারণ এখানে দুটি আলাদা বিষয় রয়েছে।
প্রথমত, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা উচিত কি না?
অবশ্যই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে তাদের ভূমিকা ও আত্মত্যাগ নথিবদ্ধ করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, সেই স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য কী ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হবে?
এখানেই ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, নান্দনিকতা, রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবহার এবং জনমতের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যদি একটি প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়, সেটি যেন কোনো ব্যক্তিপূজা বা রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতীক না হয়—এমন নীতিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
পর্ব–১০ : ‘আমার বেলায় নাজায়েজ, আপনার বেলায় জায়েজ’—এই অভিযোগ কি যৌক্তিক?
রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কোনো একটি নীতিকে যদি ধর্মীয় বা নৈতিক কারণে গ্রহণ করা হয়, তাহলে সেই নীতি রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে সমানভাবে প্রয়োগ করা উচিত।
একই কাজ ক্ষমতাসীন পক্ষ করলে বৈধ, আর বিরোধী পক্ষ করলে অবৈধ—এমন দ্বৈত মানদণ্ড ইতিহাসের জন্যও ক্ষতিকর, ধর্মীয় মূল্যবোধের জন্যও ক্ষতিকর।
তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে—দুটি স্থাপনা দেখতে একই রকম হলেই তাদের উদ্দেশ্য ও ধর্মীয় বিধানও এক হবে—এমন সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিক বা ধর্মীয়ভাবে স্বয়ংক্রিয় নয়।
পর্ব–১১ : বাংলাদেশের মানুষের সামনে এখন যে প্রশ্নগুলো
সাধারণ মানুষের প্রশ্নগুলো তাই এভাবে সাজানো যেতে পারে—
এক. ভাস্কর্য যদি ধর্মীয় কারণে নিষিদ্ধ হয়, তাহলে সেই নীতি কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য?
দুই. যদি স্মৃতিস্তম্ভ কেবল ইতিহাস সংরক্ষণের মাধ্যম হয়, তাহলে অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাসের স্থাপনাগুলো ভাঙার নৈতিক যুক্তি কী?
তিন. রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের প্রতীক পরিবর্তন করা কি ইতিহাস সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি?
চার. জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে জাদুঘর, আর্কাইভ, পাঠ্যবই ও গবেষণাকে কি আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়?
পাঁচ. রাষ্ট্রীয় অর্থে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের আগে স্থানীয় জনগণ, ইতিহাসবিদ, শিল্পী, ধর্মীয় আলেম ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত কি না?
পর্ব–১২ : নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের শেষ কথা
শেখ মুজিবের ভাস্কর্য ভাঙা এবং জুলাই শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ—দুটি ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুটি ভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।
একটিকে শুধু ধর্ম দিয়ে এবং অন্যটিকে শুধু রাজনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হলে ইতিহাসকে মুছে ফেলা নয়, বরং দলিলভিত্তিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
যে মানুষ বা রাজনৈতিক অধ্যায়কে একটি পক্ষ শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং অন্য পক্ষ সমালোচনার চোখে দেখে—তার ইতিহাসও সংরক্ষিত হওয়া দরকার। কারণ ইতিহাস মানে শুধু বিজয়ীর গল্প নয়; ইতিহাসে বিতর্ক, ভুল, অর্জন, ত্যাগ এবং মানুষের অভিজ্ঞতাও থাকে।
একইভাবে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
তবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি নীতি থাকা উচিত—
ধর্মীয় নীতি হলে তা সবার জন্য সমান,
আইনের নীতি হলে তা সবার জন্য সমান,
আর ইতিহাস সংরক্ষণ হলে সেটিও হতে হবে দলীয় পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সম্ভবত ‘কার ভাস্কর্য থাকবে, কারটা থাকবে না’—শুধু এই প্রশ্নের উত্তর চায় না।
তারা জানতে চায়—
একই রাষ্ট্রে একই নীতি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য কি না।
আর যদি ইতিহাসই সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেই ইতিহাসকে পাঠ্যবই, জাদুঘর, আর্কাইভ, গবেষণা ও দলিলের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়তো আরও টেকসই ও নিরপেক্ষ পথ হতে পারে।
নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
