পাবনা প্রতিনিধি: আব্দুস শুকুর
একটি ছোট্ট শিশু। পৃথিবীটা তখনও তার কাছে অচেনা। মা-বাবার হাত ধরে হাঁটা, তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসা—এটাই ছিল তার ছোট্ট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
কিন্তু হঠাৎ একদিন সবকিছু বদলে গেল। মা-বাবা চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
শিশুটির মনে তখন একটাই প্রশ্ন—মা কোথায়? বাবা কোথায়? কেন আর বাড়ি ফিরে আসে না?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ভারী হয়ে উঠত স্বজন-প্রতিবেশীদের হৃদয়। কান্নায় ভেঙে পড়ত শিশুটি। সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতেন আপনজনেরা। কিন্তু পৃথিবীর নিয়মে যারা চলে গেছেন, তারা আর ফিরে আসেননি।
তবে যাওয়ার আগে যেন রেখে গেছেন একটি নীরব ওসিয়ত—তাদের সন্তানকে যেন দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করে কোরআনের আলোয় মানুষ করা হয়।
সেই দায়িত্ববোধ থেকেই স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রচেষ্টা থেমে থাকেনি।
পাবনার আতাইকুলার সারাদিয়ার, শাখারীপাড়ার জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দ্বীনি শিক্ষার একটি উদ্যোগ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এতিম ও অসহায় শিশুদের এখানে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা চলছে।
একদিকে কবরস্থানের নীরবতায় চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন মা-বাবা ও স্বজনরা, অন্যদিকে তাদের রেখে যাওয়া সন্তানদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত।
দুই সারিতে বসে ছোট ছোট শিশুরা যখন একসঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করে, তখন বদলে যায় পুরো পরিবেশ। তাদের কণ্ঠে কোরআনের সুর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন খোঁজখবর নিতে আসা গ্রামবাসী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
অনেকের মুখে তখন একটাই কথা—
“আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের এই প্রচেষ্টাকে কবুল করুন।”
স্থানীয়দের অনেকেরই আকাঙ্ক্ষা—জীবনের শেষ সময়ের আগে যেন তারাও নিজেদের সন্তানদের এমন একটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখে যেতে পারেন। মাদ্রাসার কার্যক্রম ও বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করে তাদের সেই প্রত্যাশা আরও গভীর হয়েছে।
শুধু আশপাশের গ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও শিক্ষার পরিবেশ ও কার্যক্রম দেখে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে দিন দিন বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বাড়ছে মানুষের আগ্রহ ও সহযোগিতার হাত।
আলহামদুলিল্লাহ।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। মানুষের সহযোগিতা ও অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এই দ্বীনি শিক্ষা কার্যক্রম।
তাই এই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে যারা সহযোগিতা করতে চান, তারা জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থান ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন।
হয়তো কোনো এক মা আজ কবরের নীরব ঘুমে। কোনো এক বাবা হয়তো মাটির নিচে শুয়ে আছেন আপন ঠিকানায়।
কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া সন্তান যখন কোরআনের আলোয় আলোকিত হয়, যখন তার কণ্ঠে ভেসে আসে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত—তখন মনে হয়, সেই তেলাওয়াত যেন দূর আকাশ পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে প্রিয় মা-বাবার কাছে।
শেষ বিদায়ের আগে মা-বাবা কী রেখে গেলেন?
রেখে গেলেন একটি সন্তান। আর সেই সন্তানকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করার দায়িত্ব যেন তুলে দিলেন সমাজের মানুষের হাতে।
এভাবেই একটি এতিম শিশুর কান্না একদিন রূপ নিচ্ছে কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াতে। আর জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থান হয়ে উঠছে স্মৃতি, মানবিকতা ও দ্বীনি শিক্ষার এক আবেগঘন মিলনস্থল।
জান্নাতুল মাওয়া কবরস্থান
সারাদিয়ার, শাখারীপাড়া, আতাইকুলা, পাবনা।
নিউজ: আব্দুস শুকুর
সংযোগ বাংলা টিভি
সংযোগ বাংলা নিউজ ডট কম
যোগাযোগ: ০১৭২৭০৩৪৬৯০

You missed